Bamabodhini Patrika / বামাবোধিনী পত্রিকা।

Bamabodhini Patrika / বামাবোধিনী পত্রিকা।

উনিশ শতকে মেয়েদের জন্য সাময়িক পত্রিকাগুলির সম্পাদনার দায়িত্বে পুরুষেরা থাকলেও মেয়েরাও পত্রিকা সম্পাদনার এবং পরিচালনায় এগিয়ে এসেছিল।

  • প্রথম মহিলা সম্পাদিত বাংলা পত্রিকা ছিল –

 ‘বঙ্গমহিলা’।সম্পাদিকা- মোক্ষদায়িনী মুখোপাধ্যায়। প্রকাশকালঃ১৮৭০ খ্রিঃ/১২৭৭ বঙ্গাব্দ।

  • খ্রিস্টান মহিলাদের জন্য প্রথম-মহিলা সম্পাদিত সাময়িক পত্রিকা ছিল

 ‘খ্রিস্টীয় মহিলা’। সম্পাদিকা-কামিনী শীল। প্রকাশকাল-১২৮৭ বঙ্গাব্দ।

  • ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়েছিল-

  ‘পরিচারিকা’। সম্পাদিকা-মোহিনী দেবী(১৯২৪ খ্রি থেকে দায়িত্ব নেন।

  • প্রথম মুসলমান নারী সম্পাদিত পত্রিকা ছিল-

 ‘অন্বেষা’ সম্পাদিকা-সফিয়া খাতুন। ১৯২১ খ্রিঃ থেকে চট্টগ্রাম থেকে এটি বার হতো।

 

      উনিশ শতকে মেয়েদের জন্য প্রথম প্রকাশিত সাময়িক পত্রিকা ছিল ‘মাসিক পত্রিকা’।প্রকাশ করেছিলেন ডিরোজিওর দুই শিষ্য প্যারীচাঁদ মিত্র এবং রাধানাথ শিকদার ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে ১৬ই আগস্ট তারিখে। এরপর উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মেয়েদের জন্য অনেক সাময়িক পত্রিকা হয়েছিল যেমন- ‘অবলাবান্ধব পত্রিকা’,  ‘বঙ্গমহিলা’, ‘ বিনোদিনী’,  ‘হিন্দুললনা’ ইত্যাদি।তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্নছিল ‘বামাবোধিনী পত্রিকা’।

      বামাবোধিনী পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল বামাবোধিনী সভার উদ্যোগে।বামাবোধিনী সভা কেশবচন্দ্র সেন এবং ব্রাহ্ম আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল।১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে বা ১২৭০ বঙ্গাব্দে ভাদ্রমাসে কলকাতার ১৬ নং রঘুনাথ চ্যাটুয্য স্ট্রীটের বাড়ির বামাবোধিনী সভার কার্যালয় থেকে বামাবোধিনী পত্রিকা প্রথম আত্মপ্রকাশ করেছিল। মূল্য ছিল মাত্র এক আনা।মুদ্রণ সংখ্যা ছিল এক হাজার। প্রথম গ্রাহিকা ছিলেন ভুবন মোহিনী বসু।১৮৭৭ খ্রিঃ বামাবোধিনী সভা বন্ধ হয়ে গেলেও  বামাবোধিনী পত্রিকা টিকেছিল আরও ষাট বছর অর্থাৎ ১৯২২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।

           বামাবোধিনী পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম  প্রতিষ্ঠাতা নেতা উমেশচন্দ্র দত্ত।বহু বাধাবিপত্তি স্বত্বেও তিনি হরিনাভি সহ অন্যত্র ব্রাহ্মসমাজকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন।বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করার পর প্রথমে সিটি স্কুল পরে কলকাতার সিটি কলেজের অধ্যক্ষ হন।কলকাতার মানিকতলায় মূক ও বধিরদের জন্য  নির্মিত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। বামাবোধিনী পত্রিকার সম্পাদনা ছাড়া ‘ধর্মসাধন’ এবং ‘ভারত সংস্কারক’ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন।তাছাড়া বামা-রচনাবলী এবং ‘স্ত্রী লোকদিগের বিদ্যার আবশ্যকতা’ নামক পুস্তিকা রচনা করেছিলেন।উনিশ শতকে শিক্ষার উন্নতি ও নারীশিক্ষা আন্দোলনে উমেশচন্দ্র দত্তের অবদান অনস্বীকার্য।উমেশচন্দ্র দত্ত স্মরণীয় হয়ে আছেন বামাবোধিনী পত্রিকার সম্পাদনার জন্য।তিনি একাদিক্রমে চল্লিশ বছর এই পত্রিকার দায়িত্ব বহন করেছিলেন।

        বামাবোধিনী পত্রিকায় বিভিন্ন বিষয় আলোচিত হতো।থাকত ভ্রমণ বৃত্তান্ত,গল্প,উপন্যাস,কবিতা,চিত্রকলা,বিজ্ঞান, বিশ্লেষণ,বিদেশী নারী সাফল্য কাহিনী,শিক্ষা প্রসঙ্গ,স্বাস্থ্য জ্ঞান,শিশুপালন পদ্ধতি,ধর্ম আলোচনা এবং গার্হস্থ্য প্রসঙ্গ।তবে প্রধান বিষয়বস্তু ছিল তিনটি শিক্ষার প্রয়োজন ও সার্থকতা,শিশুপালন সংক্রান্ত নিয়মাবলী এবং পরিবারে রমণীর কর্তব্য ও স্থান।

         পত্রিকার প্রবন্ধাবলীর সিংহভাগের লেখক ছিলেন পুরুষ।তবে কোন অজ্ঞাত কারণে বেশিরভাগ নিজেদের নাম উল্লেখ করেননি।অবশ্য মেয়েরাও লিখেছিলেন।বামা-রচনাগুলি বামাবোধিনী পত্রিকার বিশেষ সম্পদ।জগদীশ চন্দ্র বসুর ভগিনী-দ্বয় লাবন্যপ্রভা বসু ও  স্বর্ণপ্রভা বসু, কৃষ্ণভামিনী দাস ও শৈল্যবালা জায়া এবং পরবর্তী কালে মানকুমারী বসু লিখেছিলেন।তবে অধিকাংশ লেখিকা ছিলেন অনামা গৃহবধূ।

           বামাবোধিনী পত্রিকা বনলতা দেবী সম্পাদিত অন্তঃপুরের মতো মৃদুভাষী বা সরযুবালা দত্ত সম্পাদিত ‘ভারত মহিলা’ এর মতো সোচ্চার না হয়ে মধ্যবর্তী অবস্থান নিয়েছিল।নারীশিক্ষা, নারী স্বাধীনতার সর্বোপরি সমাজে ও পরিবারে নারীর ভূমিকাকে তুলে ধরেছিল এবং মূল্যায়ন করেছিল।বাল্যবিবাহের আলোচনা বামাবোধিনীতে থাকলেও  ‘Age of consent’(1891 খ্রিঃ) যে আলোচনা বা বিলের প্রসঙ্গে সারাদেশে যে ঝড় উঠেছিল তার কোন সংকেত ছিল না বামাবোধিনী পত্রিকায়। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে আগষ্টমাসে এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় লেখা হয়েছিল-“বামাবোধিনীতে ভাষাতত্ত্ব, ভূগোল, ইতিহাস,জীবনচরিত,বিজ্ঞান,স্বাস্থ্যরক্ষা, নীতি ও ধর্ম, দেশাচার,পদ্য,গৃহঃচিকিৎসা,শিশুপালন,শিল্পকর্ম,গৃহকার্য্য ও অদ্ভূতবিবরণ প্রকাশিত হইবে”। বামাবোধিনীর উদ্দেশ্য স্পষ্টতর রূপে প্রকাশ পেল পঞ্চাশ বছর পূর্তির সময়ে।  সেই সময়ে পত্রিকায় পরিষ্কার করে বলা হয় “বঙ্গরমণীগনকে সর্ব্বপ্রকার জ্ঞানে বিভূষিত করা বামাবোধিনীর উদ্দেশ্য,এইজন্য সর্ব্বপ্রকার জ্ঞানগর্ভ প্রস্তাবই ইহাতে সন্নিবেশিত হইয়াছে।জ্ঞান প্রচার বামাবোধিনীর প্রধান উদ্দেশ্য হইলেও এই জ্ঞান যাহাতে ধর্ম্মভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হইয়া নারীজীবনের যথার্থ শোভা সম্পাদন ও কল্যানবিধান করে, বামাবোধিনীর ইহা প্রাণগত ইচ্ছা। এই জন্য পাঠক পাঠিকার মনে ধর্ম্মভাব উদ্দীপন ও সংরক্ষণের জন্য ইহা প্রথম হইতেই প্রয়াস পাইয়াছেন”।

 সূত্রঃ

1.মেয়েদের ভাবনাঃমেয়েদের সম্পাদিত পত্রিকায়(১৮৭০-১৯৪৭)

   অনিন্দিতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

2.দুই শতকের বাংলা সংবাদ সাময়িকপত্র-(সঃ)স্বপন বসু/মুনতাসীর মামুন।

3.সংবাদপত্রে সেকালের কথা ১,২ খন্ড-ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।

4.সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র-বিনয় ঘোষ।

5.সংবাদ-সাময়িকপত্রে উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ-স্বপন বসু।

6.নারী ও পরিবার বামাবোধিনী পত্রিকাঃ সংকলন ও সম্পাদনা-ভারতী রায়।