Grambarta Prokashika / গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা।

Grambarta Prokashika / গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা।

উনিশ শতকে নারায়ণের স্বাভাবিক নিয়মে কলকাতার পার্শ্ববর্তী এলাকায় বেশকিছু এলাকা সমৃদ্ধশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।বিভিন্ন পেশাজীবী  মধ্যবিত্ত মানুষজন মফস্বলের ভিড় জমাতে শুরু করে।এরা বিভিন্ন সারস্বত প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেছেন এবং সংবাদ-সাময়িক পত্র প্রকাশ করেছেন । ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলাভাষায় প্রকাশিত ৩৬টি সংবাদপত্রের মধ্যে ১৯টিই ছিল কলকাতার বাইরের। এই সব আঞ্চলিক এবং গ্রামীণ সাময়িকপত্র এবং সংবাদপত্রের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিল গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা। এই পত্রিকার কর্ণধার এবং সম্পাদক ছিলেন হরিনাথ মজুমদার, যিনি কাঙাল হরিনাথ নামে বেশি পরিচিত ছিলেন।

কাঙাল হরিনাথ ছিলেন একাধারে ছিলেন একধারে সাহিত্যশিল্পী, সংবাদ-সাময়িকপত্র পরিচালক, শিক্ষাব্রতী, সমাজসংস্কারক, সাধক ও ধর্মবেত্তা।কাঙাল হরিনাথ বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি গ্রামে ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহন করেছিলেন।দারিদ্রের কারণে হরিনাথ পড়াশুনা বেশিদূর চালিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি।কিন্তু শিক্ষার প্রসারে তিনি ছিলেন সদা সচেষ্ট। ১৮৫৫ খ্রিঃ হরিনাথ তার কয়েকজন বন্ধুর সাহায্যে কুমারখালি গ্রামে দেশীয় বিদ্যালয় স্থাপন করেন,পরে তিনি গ্রামে মেয়েদের জন্য বিদ্যালয় স্থাপন করেন।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি প্রায় ১৮টি বই লিখেছিলেন মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘বিজয় বসন্ত’, ‘কবিতা কৌমুদী’।কাঙাল হরিনাথ ছিলেন লালন ফকিরের অনুগামী।তিনি ‘কাঙাল ফকির চাঁদের দল’ নামে একটি বাউল দল তৈরি করেন।‘কাঙাল ফকিরচাঁদ ফকিরের জীবনী’ নামে একটি বাউল গানের সংকলন প্রকাশ করেন।হরিনাথের একটি বহুশ্রুত গান হল-

‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল,

পার করো আমারে…’

কাঙাল হরিনাথ মৃত্যুবরণ করেন ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে ১৬ই এপ্রিল।

তিনি সাংবাদিক-জীবন শুরু করেছিলেন ঈশ্বরগুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায়। ১৮৬৩ খ্রিঃ তিনি নিজের পত্রিকা গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা প্রকাশ করেন।মূলত গ্রাম এবং গ্রামবাসীদের অবস্থা প্রকাশের জন্য এর নাম হয় গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা।তবে মূল লক্ষ্য ছিল কৃষকদের ওপর নীলকর সাহেব ও জমিদারদের অত্যাচারের কাহিনী প্রকাশ করা।তবে এই পত্রিকায় দর্শন, সাহিত্য ও অন্য সংবাদ প্রকাশিত হতো।লালন ফকিরের গান প্রকাশ করেছিল গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা।

১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে এপ্রিল মাসে গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথমে এই পত্রিকা ছিল মাসিক।প্রথম নয় বছর এটি ছাপা হতো কলকাতার ২৩ নং আপার সার্কুলার রোডের মির্জাপুরের গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্নের ‘বিদ্যারত্ন প্রেস’ থেকে এবং পরে এটি বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি গ্রামের মথুরানাথ প্রেস থেকে মুদ্রিত হয়।এই পত্রিকাটি প্রায় ২২ বছর টিকে ছিল।প্রথমে এই পত্রিকাটি ছিল মাসিক,১৮৬৪ খ্রিঃ এটি পাক্ষিক এবং ১৮৭১ খ্রিঃ এটি সাপ্তাহিকে পরিণত হয়।১৮৮৪ খ্রিঃ নাগাদ পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।যখন পত্রিকাটি মাসিক ছিল তখন এর দাম ছিল পাঁচ আনা।

মূলত গ্রাম এবং গ্রামবাসীদের অবস্থা প্রকাশের জন্য এর নাম হয় গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা।তবে মূল লক্ষ্য ছিল কৃষকদের ওপর নীলকর সাহেব ও জমিদারদের অত্যাচারের কাহিনী প্রকাশ করা।তবে এই পত্রিকায় দর্শন, সাহিত্য ও অন্য সংবাদ প্রকাশিত হতো।লালন ফকিরের গান প্রকাশ করেছিল গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা। প্রখ্যাত লেখক মীর মুশারফ হোসেন,জলধর সেন তাঁদের লেখক জীবনের সূত্রপাত করেছিলেন গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায়।এছাড়া শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণব,অক্ষয় কুমার মৈত্র, প্রসন্নকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ ব্যক্তি এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায় হরিনাথের আক্রমণের লক্ষ্য হয়েছিলেন সমাজের সর্বস্তরের প্রভাবশালী মানুষ।সরকারি অসহযোগিতায় গ্রামবাসীর অসহায়তার কথা তুলে ধরতে ‘দেশ নষ্ট কপটে,প্রজামরে চপটে,কি কি করিবে রিপোর্টে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে।পুলিশ সম্পর্কে পত্রিকায় লেখা হয় ‘বিকারগ্রস্ত রোগীর হিক্কা উপসর্গের ন্যায় পুলিশ প্রজার উপসর্গ হইয়াছে’।আবার অন্য-জায়গায় লিখেছেন ‘আদালতের আমলাদিগের হাতপাতা রোগ’ এর কারণে মূলত দরিদ্র প্রজারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন।

গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায় নদী ও জলনিকাশী সংস্কার,ডাক ও পুলিশ সংস্কার ইত্যাদি গ্রামীণ মানুষের দাবিদাওয়া উপস্থাপিত করা হয়েছিল।ডাকঘরে মানি অর্ডারের ব্যবস্থা প্রচলনের কথা বলা হয়েছিল। দেশীয় শিল্পের উন্নতি ও বিকাশের কামনা করেছে গ্রামবার্ত্তা।এদেশের তন্তুবায় সম্প্রদায়ের দুরবস্থা এবং সরকারের উদাসীনতায় গ্রামবার্ত্তা নীরব থাকতে পারেনি।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় হরিনাথ ছিলেন দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ।ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্টের প্রতিবাদে তিনি লেখেন-“সংবাদপত্র আমাদিগের ব্যবসা নহে।তবে প্রজা কাঁদে,সেই ক্রন্দন লইয়া রাজদ্বারে ক্রন্দন করি,ভাবি রাজপুরুষগণ শুনিলে,প্রজা আর কাঁদিবে না।তাহাদের কাঁদিবার কারণ দূর হইবে।এইজন্য প্রতি-বৎসর ক্ষতি স্বীকার করিয়াছি এবং উৎকট রোগের আধার হইয়া যন্ত্রণা ভোগ করিতেছি।যার জন্য, যার প্রজার জন্য কাঁদি তিনি তার বিলক্ষণ পুরষ্কার প্রদান করিলেন।অতএব আর কাঁদিব না।”   -( গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা,১৩.৩.১৮৭৮.)

পাবনা কৃষক বিদ্রোহের সময় কলকাতার সোমপ্রকাশ,অমৃতবাজার পত্রিকা প্রজাদের নেয়নি,কিন্তু গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা অসহায় প্রজাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল।পাবনার কৃষক বিদ্রোহ-কালে তাকে জমিদার-বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও্রি হরিনাথ জানান-‘গ্রামবার্ত্তা জমিদার কি প্রজা কাহারও স্বপক্ষে বা বিপক্ষে নহে।অত্যাচার ও অসত্যের বিরোধী’।

পাবনার ইংরেজ ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট একবার এক দরিদ্র বিধবার একটি দুগ্ধবতী গাভী জবরদস্তি সংগ্রহ করে।হরিনাথ সেই অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করে ‘গরুচোর ম্যাজিস্ট্রেট’ নামে সংবাদ প্রকাশ করেন।

হরিনাথ ছিলেন আপোষহীন।তিনি ঠাকুর পরিবারের কৃষক-প্রজা বিরোধী আচরণের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন।এজন্য একাধিকবার তাঁকে আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে।কথিত আছে ঠাকুর পরিবারের লাঠিয়াল বাহিনী কাঙাল হরিনাথকে আক্রমণ করলে লালন ফকিরের দলবল তাকে রক্ষা করেছিল।অক্ষয়কুমার মৈত্র বলেছিলেন -‘হরিনাথ যাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া সুতীব্র সমালোচনায় পল্লী-চিত্র বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন

তিনি এদেশের সাহিত্য-সংসারে এবং ধর্ম্মজগতের চিরপরিচিত-তাহার নামোল্লেখ করিতে হৃদয় ব্যথিত হয়, লেখনী অবসন্ন হইয়া পড়ে।’

Prev 1 of 1 Next
Prev 1 of 1 Next