Hutom Pyanchar Naksha/হুতোম প্যাঁচার নকশা।

হুতোম প্যাঁচার নকশা।

উনিশ শতকে বাঙালী সমাজে ও ভদ্রলোক সম্প্রদায়ের স্ববিরোধ এবং ভন্ড লোকাচারকে ব্যাঙ্গ ও বিদ্রূপ করে বহু প্রহসন ও নকশা লেখা হয়েছিল এবং প্রকাশিত হয়েছিল। হুতোম প্যাঁচার নকশার মতো কোন নকশা এত জনপ্রিয় হতে পারেনি।নকশা শব্দটি কালীপ্রসন্ন জনপ্রিয় করলেও এটির প্রথম নিদর্শন পাওয়া সমাচার দর্পণ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বাবুর উপাখ্যান’(১৮২১ খ্রিঃ)এ। ভবানীচরন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কলিকাতা কমলালয়’ এবং ‘নববাবু বিলাস’ ছিল অন্যতম উল্লেখযোগ্য নকশা।

এখন প্রশ্ন হলো নকশা কি? নকশা হলো হাস্যরস পরিপূর্ণ ব্যঙ্গাত্মক রচনা যার মাধ্যমে সামাজিক অনাচার, ব্যাক্তিবিশেষের প্রতি বিদ্রূপ করা হতো এবং সামাজিক দোষ দূর করতে শিক্ষাদান করা হতো। নকশা প্রধানত আকৃতিতে হয় নাতিদীর্ঘ, ভাষা হয় লঘু এবং ইঙ্গিতপূর্ন।

হুতোম প্যাঁচার নকশা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল আনুমানিক ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ।তাতে ছিল একটি মাত্র নকশা ‘চড়ক’।এর সঙ্গে আরও নকশা যোগ করে ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’(প্রথম ভাগ)।১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশিত হয়। ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ দুটি ভাগ একত্রে প্রকাশিত হয়।

হুতোম বলতে ঠিক কাকে বোঝানো হয়েছে সে নিয়ে বিতর্ক আছে।অনেকে মনে করতেন কালীপ্রসন্নের লিপিকার ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও পারিষদ নবীন কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর ছদ্মনাম ছিল হুতোম প্যাঁচা।তবে অধিকাংশ গবেষক এমনকি ‘সটীক হুতোম প্যাঁচার নকশা ‘গ্রন্থের রচয়িতা অরুণ নাগ মনে করেন ‘হুতোম প্যাঁচা’ আদতে কালীপ্রসন্ন সিংহ।

এখন প্রশ্ন হলো কালীপ্রসন্ন কেন ‘হুতোম প্যাঁচা’ ছদ্মনাম ধারণ করলেন।কালীপ্রসন্ন তার কলম শানিয়েছিলেন সমাজের ওপরতলার ক্ষমতাশালী মানুষদের উদ্দেশ্যে সেক্ষেত্রে  নিজের নাম ব্যবহার করলে সরাসরি বা আইনগত আক্রমণের মুখে পড়তে হতো। তাছাড়া ছদ্মনাম ব্যবহার ছিল সেই সময়ের প্রচলিত ধারা।পশুপাখিদের মধ্যে প্যাঁচার বিচক্ষণতা নিয়ে দেশী-বিদেশী বহু গল্প আছে।নিশাচর বলে প্যাঁচা সকলের গোপন কীর্তি জানতে পারে।

হুতোম প্যাঁচার নকশায় ‘হুজুগ’ এবং ‘কেচ্ছা’ মিলেমিশে রয়েছে।হুতোম অনেকক্ষেত্রে সামাজিক উৎসবকে কেন্দ্র করে সাহিত্যরচনা চেয়েছেন, বহুজন-জ্ঞাত, শোরগোল জাগানো যে কোনও বিষয়ই তার কাছে হুজুক।কেচ্ছা হচ্ছে কিসসা=কাহিনী এবং কুৎসার মিলিত রূপ।তৎকালীন সমাজে মুদ্রিতকারে যে সব কুৎসা বা কেচ্ছা প্রকাশিত হতো তার সঙ্গে হুতোমি কেচ্ছার বিস্তর ফারাক ছিল।গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য যিনি ‘সংবাদ ভাস্কর’ এর মতো নামকরা পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি একই সঙ্গে ‘সংবাদ রসরাজ’এর মতো অশ্লীল কুৎসা পত্রিকা চালিয়েছিলেন প্রায় আঠারো বছর।অন্যদিকে ‘পাষণ্ড পীড়ন’ এর সম্পাদক ছিলেন বিখ্যাত কবি ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকার সম্পাদক ঈশ্বর গুপ্ত।

অনেকের মতে হুতোমের নকশার ওপর টেকচাঁদ ঠাকুর ওরফে প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ এর প্রভাব ছিল। আবার কেউ কেউ চার্লস ডিকেন্সের ‘Sketches by Boz’ জাতীয় রচনার প্রভাব খুঁজে পেয়েছেন।

হুতোমের নকশায় উনিশ শতক,কলকাতা এবং বাঙালীয়ানা তিনটিই অপরিহার্য চরিত্রলক্ষন।তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাঙালীয়ানা। তৎকালীন শহুরে বাঙালীর আচরণ, মানসিকতা, ভাষাকে কালীপ্রসন্ন হাজির করেছেন অন্তরঙ্গ কথকতার ভঙ্গিতে।

হুতোম তার রচনায় মূলত তিনটি শ্রেণীকে বিদ্রূপ করেছেন।

১।সাহেবি ওল্ড-ইংরেজি শিক্ষিত সাহেবি চালচলনের অন্ধ অনুকরণকারী।

২।নিউ- ইংরেজি শিক্ষিত নব্য-পন্থী যারা সাহেবি চালচলনে অনুকরণকারী নয়।

৩।খাস হিন্দু-ইংরেজি না জানা গোঁড়া হিন্দুসমাজ।

হুতোমের আক্রমণের মূল লক্ষ্য সমাজের ওপরতলার বড়মানুষেরা। ভবানীচরনের মতে কলকাতার হঠাৎ বড়মানুষেরা ছিলেন চার প্রকার-দালাল,দাদনি,বেনিয়ান ও দেওয়ান। হুতোমের অধিকাংশ নকশার উদ্দেশ্য ছিল একটাই উদ্দিষ্টকে হীন, নীচ প্রতিপন্ন করা,অপমান করা,হাস্যোম্পদ করা।হুতোম যাদের ব্যাঙ্গ করেছেন তারা সবাই শ্রেণীর,কেউই নিতান্ত সাধারণ বা অপরিচিত মানুষ নন।নকশায় উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে অনেকেই সুপরিচিত যেমন কালিদাস,কৃত্তিবাস,রামমোহন রায়,ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রভৃতি।হুতোম অনেক প্রতিষ্ঠিত ওপরতলার মানুষের ‘গুণ বর্ণনা’র ক্ষেত্রে ছদ্মনাম দিয়েছিলেন খুব সম্ভবত আইনের থেকে বাঁচতে।এই রকম সাতজন বাস্তব চরিত্র পাওয়া যায় যেমন-বাগম্বর মিত্র,প্যালানাথ বাবু,পদ্মলোচন দত্ত,ছুঁচো শীল, পেঁচো মল্লিক,রাজা অঞ্জনাদেব বাহাদুর ও বর্ধমানের হুজুর আলী।বাগম্বর মিত্র সম্ভবত দিগম্বর মিত্র,পেচোঁ মল্লিক সম্ভবত হলধর মল্লিক,ছুঁচো শীল সম্ভবত মতিলাল শীল। হুতোম একমাত্র ‘স্নানযাত্রা’ ছাড়া কোথাও ‘বর্তমান’কে  নকশার বিষয় করেননি।খোঁচা দেবার জন্য তিনি অতীত কেচ্ছাকে বেশি পছন্দ করতেন।হুতোম কোন ঘটনা বা ব্যক্তিকে  খণ্ডিত রূপে উপস্থাপিত না করে তাঁকে যথার্থ পটভূমিকায় বিবৃত করেছিলেন।

হুতোমের নকশায় একদিকে চড়ক, রথ,দুর্গাপূজা, স্নানযাত্রা, ইত্যাদি পার্বণের উল্লেখ পাই।অন্যদিকে কলকাতার সমাজজীবনের অন্ধকার দিক যেমন গণিকা বিলাস,ভ্রূণ হত্যা,মাদকদ্রব্যের কারবার ইত্যাদিকে তুলে ধরা হয়েছে।এছাড়া জাল প্রতাপাদিত্য, কৃশ্চানি হুজুগ, মিউটিনি, লঙ সাহেব ইত্যাদি ঘটনা স্থান পেয়েছে।বুজরুকি এবং ধাপ্পাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি লেখেন ‘মহাপুরুষ’, ‘হোসেন খাঁ’, ‘ভূত না মানে’।তিনি হিন্দু, বৈষ্ণব,ব্রাহ্মসমাজের গোঁড়ামি ভণ্ডামির কদর্য দিকগুলিকে তুলে ধরেছেন।সর্বোপরি উনিশ শতকে বাঙালীদের ইংরেজ তোষণকে তিনি নিন্দা করেছেন।

হুতোমের নকশা প্রকাশিত হবার পর দুটি প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়।অপাঠ্য-কুৎসা সাহিত্যের প্রকাশ্য সমাজ থেকে নির্বাসন দ্বিতীয়ত ‘জবাব’ এবং ‘পাল্টা জবাব’ এর জোয়ার। অপাঠ্য,কুৎসা সাহিত্যের জনপ্রিয়তা হারানোর পেছনে অবশ্য কারণ ছিল পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তার,ব্রাহ্ম আন্দোলন এবং অন্যান্য কারণ।হুতোমের নকশা বের হবার পর তার প্রত্যুত্তরে একাধিক ‘জবাব’ বের হয়েছিল