19th CenturyHistory of BengalIndian History

Kaliprasanna Singha / কালীপ্রসন্ন সিংহ ।

কালীপ্রসন্ন সিংহ ।

উনিশ শতকে কলকাতার ‘ভদ্রলোক’ বা ‘বাবু সম্প্রদায়’ এর মধ্যে কালীপ্রসন্ন সিংহ ছিলেন অন্যতম চিত্তাকর্ষক চরিত্র।মাত্র ত্রিশ বছরের জীবনে নানা সৃষ্টিকর্ম, বর্ণময় ঘটনাবলী এবং বিচিত্র বিতর্কের সাক্ষী ছিলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। কালীপ্রসন্ন উনিশ শতকের বাঙালী সমাজকে একদিকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছেন অন্যদিকে নানা স্ববিরোধকে তীব্র কষাঘাত করেছেন।

১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে জোড়াসাঁকোর খ্যাতনামা সিংহ পরিবারে কালীপ্রসন্ন সিংহ জন্মগ্রহন করেছিলেন। কালীপ্রসন্ন সিংহের প্রপিতামহ শান্তিরাম ছিলেন নিমকের দেওয়ান এবং জোড়াসাঁকোর সিংহ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা।১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে পিতা নন্দলাল সিংহের মৃত্যু হলে প্রতিবেশী এবং সম্পর্কে কাকা হারানচন্দ্র ঘোষের তত্ত্বাবধানে তিনি বড় হন। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি হিন্দু কলেজের ছাত্র ছিলেন।গৃহশিক্ষকের কাছে তিনি পৃথকভাবে বাংলা, সংস্কৃত এবং ইংরেজি শিখেছিলেন।

১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে কালীপ্রসন্ন প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিদ্যোৎসাহিনী সভা’। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে ‘বিদ্যোৎসাহিনী’ পত্রিকার সম্পাদক হন।পরের বছর ‘বিদ্যোৎসাহিনী রঙ্গমঞ্চ’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে ‘সর্ব্বতত্ত্বপ্রকাশিকা’ মাসিকপত্র প্রকাশ করেন। কালীপ্রসন্ন ‘বিবিধার্থ সঙ্গহ’ এবং ‘পরিদর্শক’ নামে দুটি পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন।এতগুলি পত্রিকা সম্পাদনা করলেও অস্থির মতি কালীপ্রসন্নের হাতে কোনও পত্রিকার বছর খানেকের বেশী টিকে থাকেনি।

পত্রিকা সম্পাদনার পাশাপাশি কালীপ্রসন্নর সাহিত্য প্রতিভা প্রকাশ পেয়েছিল ‘বাবু’ নাটক( ১৮৫৪ খ্রিঃ), ‘বিক্রমোর্বশী’ নাটক(১৮৫৬ খ্রিঃ),’সাবিত্রী সত্যবান’ নাটক (১৮৫৮ খ্রিঃ), ‘মালতীমাধব’ নাটক(১৮৫৬ খ্রিঃ)সমূহের  মাধ্যমে।কালীপ্রসন্নের জীবনের শ্রেষ্ঠ অবদান ‘মহাভারত’ এর অনুবাদ এবং ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ রচনা।

১৮৬০ খ্রিঃ থেকে ১৮৬৬ খ্রিঃ মধ্যে ‘পুরাণ সংগ্রহ’ নামে মূল  সংস্কৃত থেকে বাংলা ভাষায় মহাভারত অনুদিত হয় এবং প্রকাশিত হয়।সম্ভবত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরে পরামর্শে দশজন পণ্ডিত এই অনুবাদ কর্ম সম্পন্ন করেন।তবে কালীপ্রসন্ন নিজেও ভাষান্তরের কাজ করেছিলেন।

 

তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি অবশ্যই ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’।এই গ্রন্থটির প্রথমভাগ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে।এতে ‘হুজুক’ ও ‘কেচ্ছা’ মিলেমিশে রয়েছে।হুতোম মূলত তিন ধরনের মানুষদের  নিন্দা করেছেন যেমন-সাহেবি ওল্ড, নিউ এবং খাস হিন্দু।‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’য় সামাজিক দোষ সংশোধনের প্রচেষ্টার মোড়কে হুতোম সমসাময়িক বহু চরিত্র এবং ঘটনাবলীর ব্যাঙ্গ করেছেন।

কালীপ্রসন্নের চরিত্রের দুটি দিক ছিল।একদিকে সমাজের চাটুকার,ভন্ড, আমুদে ধনী মানুষদের তীব্র ব্যঙ্গবিদ্রূপে ও বাক্যবাণে জর্জরিত করা অন্যদিকে সৎকর্মের দ্বারা লোকচক্ষুতে নিজে সম্মানিত হওয়া।

কালীপ্রসন্ন ছিলেন উদারমনস্ক ব্যক্তি।বিধবা বিবাহ আইনের তিনি ছিলেন কট্টর সমর্থক।বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়নের পর তিনি ঘোষণা করেন যে ব্যক্তি বিধবাকে বিবাহ করবে তাকে তিনি এক হাজার টাকা ঘোষণা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন।এমনকি নীলদর্পণ অনুবাদ ও প্রকাশের জন্য সরকার রেভারেন্ড জেমস লঙকে যে অর্থদন্ড দেন, সেই অর্থ কালীপ্রসন্ন দান করেন।একাধিক সাময়িক পত্রিকার দুর্দশার সময়ে কিংবা সাহিত্যচর্চায় উৎসাহ দানের উদ্দেশ্যে কালীপ্রসন্ন অকাতরে দান করেছিলেন। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি তার কাজের জন্য অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেট এবং জাস্টিস অব পিস পদলাভ করেন।

কালীপ্রসন্ন চেনা ছকে ধরাবাঁধা জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন না। জীবনের প্রতি মূহুর্তকে তিনি নিজের মতো করে উপভোগ করেছেন।কখনও উত্তর কলকাতার বাগানবাড়িতে আমোদপ্রমোদে মদ ও চরসের নেশা উৎসবে কিংবা ইয়ার বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে মজলিশে।একদিকে দেদার হাতে খরচ অন্যদিকে অকৃপণ ভাবে দানধ্যানে খুব অল্প সময়ে কালীপ্রসন্ন দেউলিয়া হয়ে পড়েন।এদিকে তিনি তীক্ষ্ণ কলমের খোঁচায় তিনি কলকাতার ‘ভদ্রলোক’দের বেদম চটিয়ে সকলের চক্ষুশূল হয়ে পড়েছিলেন।১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে তার আর্থিক অবস্থার পতন ঘটে। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ  তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি হয়।মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত,অতিরিক্ত মদ্যপানে ফলে ভগ্নস্বাস্থের অধিকারী কালীপ্রসন্ন সিংহ এই মামলা মোকদ্দমার ভার সহ্য করতে পারেননি। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে মাত্র তিরিশ বছর বয়সে কালীপ্রসন্ন সিংহের মৃত্যু হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *